Newspaper: Bonik Barta
বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই? এমএসএমই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দেশের জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ এবং শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১.১৮ কোটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক শিল্পে ৩.০৮ কোটি মানুষ কর্মরত। এ খাত গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে, দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি। টেকসই উন্নয়নের জন্য এমএসএমই খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অপরিহার্য।
ট্রাস্ট ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, টার্ম লোন, এলসি, এলটিআর ও ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা দিচ্ছে। বিশেষ পণ্যের মধ্যে রয়েছে—নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ট্রাস্ট নন্দিনী’, আংশিক জামানতভিত্তিক ‘ট্রাস্ট সূচনা’ (৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত), সবুজ শিল্পের জন্য ‘ট্রাস্ট পাওয়ার’ ও ‘ট্রাস্ট সুফলা’। নতুন উদ্যোক্তারা এখন মাত্র ৪ শতাংশ সুদে স্টার্টআপ লোন পাচ্ছেন। এছাড়া ‘ট্রাস্ট প্রান্তিক’ নামে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ (২৫ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা) চালু আছে, যার জন্য আগে থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন নেই। ব্যাংক বর্তমানে ডিজিটাল লোন প্রক্রিয়া, এমএফআই অংশীদারত্ব ও ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের চাপে এসএমই উদ্যোক্তারা নানা প্রতিকূলতার মুখে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে শুধু ঋণদাতা নয়, উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হলো ঋণ পুনঃতফসিল ও কিস্তি পুনর্বিন্যাস, কার্যকর মূলধনের পুনঃসরবরাহ, উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং বাজার সংযোগ ও দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ। ট্রাস্ট ব্যাংক নিয়মিত উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা ও পরামর্শ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে এসএমই ঋণের ঝুঁকি ভাগ হয়ে যাওয়ায় বড় করপোরেট ঋণের চেয়ে তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি; তার পরও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা আবশ্যক।
নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?
হ্যাঁ, ট্রাস্ট ব্যাংক নারী ও তরুণ উদীয়মান ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উদ্যোক্তা উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ট্রাস্ট নন্দিনী’ এবং ‘ট্রাস্ট সূচনা’ (আংশিক জামানতভিত্তিক অর্থায়ন)-এর মতো বিশেষ ঋণ সুবিধা রয়েছে, যা সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। তরুণ ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ অর্থায়ন সুবিধা রয়েছে, যেখানে জামানতের চেয়ে ব্যবসার সম্ভাবনা, উদ্ভাবনী ধারণা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি সেবার গুণগত মান ও প্রাপ্যতা আরো উন্নত করতে ভবিষ্যতে ডিজিটাল লোন প্রসেসিং এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
ডিজিটাল প্রযুক্তি ঋণ প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করেছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ‘ট্রাস্ট মানি’ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে ঋণ আবেদন ও ই-কেওয়াইসি চালু আছে। ফিনটেক অংশীদারত্বের মাধ্যমে পেমেন্ট সলিউশন ও ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট যুক্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এআই ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং চালু হলে জামানতহীন ঋণ বিতরণ আরো বিস্তৃত হবে। ডিজিটাল মনিটরিং ও স্বয়ংক্রিয় ডকুমেন্ট যাচাই সময় ও খরচ কমাবে এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করবে। ট্রাস্ট ব্যাংক এ বিষয়ে ভিত্তি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ট্রাস্ট ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই পুনঃঅর্থায়ন ও প্রণোদনা স্কিমগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ লক্ষ্যে হেড অফিসে একটি বিশেষায়িত ‘রিফাইন্যান্স স্কিম ডেস্ক’ গঠন করা হয়েছে, যা দেশব্যাপী শাখা নেটওয়ার্ককে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সমন্বয় সহায়তা প্রদান করে, ফলে গ্রাহক পর্যায়ে সেবা আরো দ্রুত ও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যার মধ্যে রয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম, ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রান্তিক ঋণ কর্মসূচি, ৩ হাজার কোটি টাকার নারী স্মল এন্টারপ্রাইজ রিফাইন্যান্স স্কিম, ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড রিফাইন্যান্স স্কিম এবং ৩০০ কোটি টাকার এসএমই ফাউন্ডেশন তহবিল। পাশাপাশি আবেদন গ্রহণ, নথিপত্র যাচাই এবং ঋণ প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি ধাপে আমাদের প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন, যাতে এ আর্থিক সুবিধাগুলো দ্রুততম সময়ে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়।
এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা—মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এমএসএমই খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ জরুরি। জামানত সংকট মোকাবেলায় ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস) আরো সম্প্রসারণ ও কার্যকর করতে হবে। ক্যাশ ফ্লোভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন ও ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং চালু করলে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে। উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল আরো বাড়াতে হবে এবং এসএমই ঋণের সুদের হারের ওপর একটি সুরক্ষা সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। বাজারে প্রবেশ সীমাবদ্ধতা দূর করতে সরকারি ক্রয়নীতিতে (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট) এমএসএমই কোটা নির্ধারণ, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলা ও রফতানিমুখী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রদান করা দরকার। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব।
